বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়--- ভাষার উত্তরাধিকার

অগ্নি রায়

যদি হাজার হাজার বছর আগের তমসা নদীর ধারের সেই যুগল বক খুন হওয়ার ঘটনা থেকেই ধরা যায়, তবে দেখা যাবে, সাহিত্য প্রসঙ্গে পৃথিবী সেই জন্মলগ্ন থেকেই নাছোড় বাচ্চার মত একদিকে চলে গিয়েছে। তা হল, ভাষা দিয়ে বিষয়বস্তু মনন চিন্তা অবচেতনার কাছ থেকে সমস্ত প্রাপ্যটুঠু আদায় ও উসুল করা। তমসা পারের মিথুনরত বক-হত্যার পর ভাষার নেশায় বিভোর হওয়া এক দস্যুর মুখনিঃসৃত কবিতা— মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাঠত্মমগমঃ শাশ্বতী সমঃ— এক সার্বভৌম ভাষা-অথরিটঠ¿ তৈরি করেছিল সাহিত্য জন্মকাল থেকেই।
সাহিত্যের এই একগুঁয়ে ভাষাচেতনাঠসূত্র ধরেই একটা প্রশ্ন শ্রোতামাতৠরই করতে পারেন অত্যন্ত ন্যায্যভাব েই। তা হল, সেই রামায়নের যুগের ছন্দ à¦…à¦²à¦™à§à¦•à¦¾à¦°à¦®à§Ÿà ¤à¦¾ আজ বহু সময়পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে দেশে দশে শতধাবিভক্ঠহয়ে কি সম্পূর্ণ বদলে যায়নি?
অবশ্যই গিয়েছে বাইরের দিক থেকে। কিন্তু সুধীবৃন্দ, এখানে যেটা আমি বলতে চাইছি, এবং কেন এই শিবের গীত গাইছি তা ক্রমশ পরে স্পষ্ট হবে, তা হল, ভাষা বলতে কোনও প্রসাধন বা গহনা নয়। ভাষা হল, লেখার গায়ের চামড়া। যার চিক্কন আসে ইতিহাসের ধারা বয়ে। শুধু সময়েরই নয়, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি এবং হরিপদ à¦•à§‡à¦°à¦¾à¦¨à§€à¦¦à§‡à¦°à ¦“ ইতিহাস।
এবারে কথাটা হল, সাহিত্যের ইতিহাসে এক একটা সময় আসে যখন নতুন সাহিত্যভাষ ার প্রয়োজন হয়। ইউরোপে যা নাকি এসেছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি যখন সেখানে সিম্বলিস্ট আন্দোলনের জন্ম হয়। তার আগে অনেককাল পর্যন্ত গল্প ও উপন্যাসকে কবিতার চেয়ে নিকৃষ্ট আর্ট ফর্ম মনে করা হত। সেখনে গুস্তভ ফ্লব্যেয়াঠথেকে দেখা দিল গদ্যের সেই à¦˜à¦°à¦¾à¦¨à¦¾â€”à¦•à§‹à¦¨à ¦“ মহত কাব্যেরও যা নাকি বীজমন্ত্র---- সেই ভাষার পরম পরমাণু বিস্ফোরণ। অর্থাত গদ্যের ভাষা যেখানে কাব্যিক না হয়েও বাক্যকে একধরণের ফ্লাইট বা উড়ান দিতে পারে। বাক্যের নির্ধারিত অর্থ বা বাচ্যার্থঠে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাক্য যেখানে তার লিমিটেড অর্থকে অতিক্রম করে যায়। করে, বিভিন্ন বাড়তি উদ্বৃত্ত সংকেত বা সারপ্লাস মিনিং তৈরি করতে থাকে। সাহিত্য আন্দোলনের পর ভাষা বৈশিষ্টহীঠ, à¦¸à¦¿à¦—à¦¨à§‡à¦šà¦°à¦¹à§€à ¨ কোনও লেখক সেভাবে কল্কে পাননি ইউরোপে।
গর্ব করে বলতে পারি পৃথিবীতে হয়তো বাংলাই একমাত্র সাহিত্য যেখানে প্রথম প্রজন্মের ঔপন্যাসিকঠŸà¦¿à¦‡ দেখা দিলেন ভাষা ম্যাজিকের কবচটি নিজের কলমে ভরে নিয়ে – যে ম্যাজিকের মর্ম কথা কবিতারও! উতস ভাষা (source of language) এবং উপস্থাপিত ভাষা (presented language)-র মধ্যে যার অনিঃশেষ আদানপ্রদাঠ। বলা বাহুল্য এই ভাষা জাদুকরটির নাম বাবু বঙ্কিমচন্ঠ¦à§à¦° চট্টোপাধ্ঠায়। বাংলা সাহিত্য আজও যে যে কারণে বঙ্কিমবাবৠà¦° কাছে ঋণী, তার একটি হল, কোনও দেশের সাহিত্য জন্মলগ্নেঠ° প্রায় গোড়াতেই উপন্যাসের মাধ্যমে এক ভাষা বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা--- এমন উদাহরণ যে কোনও দেশেই খুব দুর্লভ।
এখানে এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক বঙ্কিমের à¦•à¦¾à¦²à¦–à¦¨à§à¦¡à¦•à§‡à ¥¤ ১৮৫৭ তে হয়েছে সিপাহি বিদ্রোহ। তার পরবর্তী দশকগুলিতে ইতিহাস বোধ এবং স্বদেশচেতঠ¨à¦¾ তরঙ্গের মত ছড়িয়ে গিয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির মধ্যেও। স্বাধীনতা শব্দটি সবে মন্ড পাকাচ্ছে বোমা হয়ে যে কোনও সময়ে ফাটবে বলে। আবার অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত বিশেষত ইংরাজী শিক্ষাপ্রঠপ্ত মধ্যবিত্ত গঠনের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। তাদের মনোজগতের শক্তি এবং বিকার দুই-ই ধরা পড়তে শুরু করেছে। সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটে গিয়েছে তৃণমূল স্তরে।
সমসাময়িক প্রজন্ম বাঙালি মধ্যবিত্তৠর সমস্ত স্ববিরোধ, সংকোচ, সংশয় এবং বেদনার ভিতরদিক থেকে বঙ্কিম ছেনে নিয়েছিলেন তাঁর ভাষা। আমরা এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি, ইতিহাসদীপঠ¿à¦¤ উপন্যাসই ছিল তাঁর আসল খেলার জায়গা, তিনি রাজমোহনস ওয়াইফ লিখে যাত্রারম্ভ করেছেন ঠিকই কিন্তু দুর্গেশননৠà¦¦à¦¿à¦¨à§€à¦¤à§‡à¦‡ তাঁর প্রতিষ্ঠার আসন পাকা হয়। তাঁর লেখকজীবন শেষও করেছেন যে ত্রয়ী উপন্যাস দিয়ে, সেই তিনটি উপন্যাসও ইতিহাসের আলোয় আলোকিত। উপন্যাস লেখা থামিয়ে দেওয়ার বহু পরে আবার সৃজনে হাত দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা রাজসিংহ উপন্যাসেরঠ‡ à¦¸à¦‚à¦¸à§à¦•à¦¾à¦°à¦•à¦¾à œà¥¤
সময় অল্প অথচ বঙ্কিমসাহঠ¿à¦¤à§à¦¯ সসাগরা। কিন্তু চলতি কথায় বলে, একটি ভাত টিপলেই পরমান্নের মাহাত্ম্য বোঝা যায়। এ ক্ষেত্রে আমরা কপালকুন্ডঠ²à¦¾à¦•ে একবার ফিরে পড়ি। শতাব্দির ঝুলো ছেড়ে আসুন পাঠক, আরও একবার এই উপন্যাসটিঠপাতা উল্টাই। চলে আসি সেই জায়গাতে যেখানে কাপালিকের পরামর্শে কপালকুন্ডঠ²à¦¾à¦•ে স্নান করিয়ে আনতে যাচ্ছে সুরা প্রজ্জ্বলি ত নবকুমার।
“নবকুমার কপালকুন্ডঠ²à¦¾à¦° হস্ত ধারণ করিয়া শ্মশানভূমঠর উপর দিয়া স্নান করাইতে লইয়া চলিলেন। তাঁহাদিগেঠ° চরণে অস্থি ফুটিতে লাগিল। নবকুমারের পদের আঘাতে একটা জলপূর্ণ শ্মশান কলস ভগ্ন হইয়া গেল। তাহার নিকটেই শব পড়িয়া ছিল – হতভাগার কেহ সতকার করে নাই। দুইজনেরই তাহাতে পদস্পর্শ à¦¹à¦²à¥¤â€¦â€¦â€¦à¦•à¦ªà¦¾à ¦²à¦•ুন্ডলা দেখিলেন নবকুমারের হস্ত কাঁপিতেছে, কপালকুন্ডঠ²à¦¾ স্বয়ং নির্ভীক নিষ্কম্প।
কপালকুন্ডঠ²à¦¾ জিজ্ঞাসা করিলেন, স্বামীন! ভয় পাইতেছ?
নবকুমারের মদিরার মোহ ক্রমে শক্তিহীন হইয়া আসিতেছে। অতি গম্ভীরস্বঠ°à§‡ নবকুমার উত্তর করিলেন, ভয়ে মৃম্নয়ী? তাহা নহে।
কপালকুন্ডঠ²à¦¾ জিজ্ঞাসা করিলেন, তবে কাঁপিতেছ কেন ? ....... নবকুমার কহিলেন, ভয়ে নহে। কাঁদিতে পারিতেছি না, এই ক্রোধে à¦•à¦¾à¦à¦ªà¦¿à¦¤à§‡à¦›à¦¿à ¤â€œ
পাঠক লক্ষ্য করুন, ভাষার এই ক্ষুরের ধারওয়ালা ব্যবহার, যা ক্রমশ বিষয়বস্তুঠে শান দিয়ে যাচ্ছে। এই ব্যবহার এখনও কি আধুনিকতম নয় ? কাঁপছে কেন নবকুমার ? না, ক্রোধে। ক্রোধ কেন ? প্রিয়তমাকৠবধ করার জন্য সে স্নান করাতে নিয়ে যাচ্ছে তবু তার কান্না পাচ্ছে না--- তাই ক্রোধ! ক্রোধ এবং অশ্রু এখানে পরষ্পরের জায়গা দখল করে নিচ্ছে আহা এক অপূর্ব à¦¬à¦¾à¦—à¦­à¦™à§à¦—à¦¿à¦®à ¾à§Ÿà¥¤ আজ যে নবীন কিশোরটি আস্তিন গুটিয়েছে তার জীবনের প্রথম উপন্যাসটি লেখার জন্য, তার কাছেও এই ভাষা অভিজ্ঞতা এক অনন্য শিক্ষাস্বঠূপ।
কপালকুন্ডঠ²à¦¾à¦° প্রতিটি পরিচ্ছদ শুরু হয়েছে কবিতার পংক্তি দিয়ে – যে ঘরানা আজকের আধুনিক গদ্যকাররাঠ“ ব্যবহার করে থাকেন। দেখে নেওয়া যাক কোন কোন কবির পংক্তি ব্যবহার করেছেন বঙ্কিম? রয়েছেন অবশ্যই শেক্সপিয়রॠ¤ কিটস, কালিদাস, বায়রনও। কিন্তু অন্তত ছটি পরিচ্ছদের মাথায় মুকুটের মত জ্বলজ্বল করছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ভেবে দেখুন, স্বেচ্ছাচঠ¾à¦°à§€, মাতাল, শব্দের পুজারী এক সমসাময়িক কবিকে সাহিত্যসম্ র্রাট বঙ্কিম আহ্বান করেছেন আন্তর্জাতঠক এই কবি সম্মেলনে একাসনে বসার জন্য। বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিকে কত আগেই মর্যাদা দিতে, চিনতে ভুল হয়নি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকৠ‡à¦°à¥¤

বলার উদ্দেশ্য এটাই যে, সার্থক কাব্যভাষাঠদোর্দন্ড এক গদ্যরূপ (যা কিনা অতি à¦•à¦¾à¦¬à§à¦¯à¦¿à¦•à¦¦à§‹à ·à§‡ এলিয়ে পড়েনি একবারও) ও মনন কবচকুন্ডলৠ‡à¦° মত ধারণ করেছিলেন বঙ্কিমচন্ঠ¦à§à¦° চট্টোপাধ্ঠায়। আজকের সমসাময়িক à¦—à¦¦à§à¦¯à¦²à§‡à¦–à¦•à¦¦à §‡à¦° কাছেও যে কবচকুন্ডল এক পরম ঈর্ষার বিষয়।
অতএব একেবারে গোড়াতেই অসীম ভাগ্যক্রমৠ‡ আমরা দেখা পেয়েছিলাম এমন একজন ঔপন্যাসিকৠ‡à¦° যাঁর ভাষাবোধ ছিল ভবিষ্যতের দিকে আগুয়ান। সেই বুদ্ধিদীপৠত এবং ভাষানির্ভর বাংলা উপন্যাস পরবর্তীকাঠ²à§‡ নিছক শারদীয় কলকাকলিতে পরিণত হল কী করে সেই বির্তকিত বিষয়ে এখন আর যাচ্ছি না! শুধু এটুকুই বলার যে একজন বঙ্কিমকে পেতে ইউরোপকে তার প্রথম দিককার উপন্যাসের থেকে প্রায় ৪০০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল গুস্তভ ফ্ল্যবেয়াঠপর্যন্ত। আজকের মার্কেজ কুন্দেরারঠ¾ সেই ফ্ল্যবেয়াঠকেন্দ্রিক ভাষা à¦†à¦¬à¦¹à¦¾à¦“à§Ÿà¦¾à¦¤à§‡à ‡ নিঃশ্বাস নিয়ে থাকেন। ঠিক তেমনই বঙ্কিমের তৈরি করা ভাষা বিশ্বের কাছে ঋণ রয়ে যায় সতীনাথ শরদিন্দু কমলকুমার তারাশঙ্কর হয়ে আজকের প্রজন্মের গদ্য নির্মাতাদৠর।